সমুদ্র বাণিজ্য খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরস্পরের ওপর আরোপিত পাল্টাপাল্টি বন্দর ফি কার্যকর হয়েছে গতকাল। এতে বৈশ্বিক শিপিং খাতের কোম্পানিগুলোর সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহন ব্যয় বাড়তে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিষয়টি গোটা বৈশ্বিক সমুদ্র পরিবহন খাতকে আবারো অস্থিতিশীল করে তোলার জোর আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ ও পরিবহন খাতে দুই দেশের হিস্যা বিবেচনায় তারা বলছেন, ছুটির মৌসুমের খেলনা থেকে শুরু করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পর্যন্ত সব ধরনের পণ্যে এর প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যেই আবার জাহাজ থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণসংক্রান্ত জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলোর ওপরও এ বাড়তি ফি আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে বর্তমানে আবারো নতুন অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন খাত। খবর রয়টার্স ও নিক্কেই এশিয়া।
গত সপ্তাহে দুষ্প্রাপ্য খনিজের রফতানি আরো কঠোর করে বেইজিং। এরপর চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে মার্কিন মালিকানাধীন, পরিচালিত, নির্মিত বা পতাকাবাহী জাহাজের ওপর বিশেষ চার্জ আরোপের ঘোষণা দেয় চীন।
অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পই বাণিজ্যযুদ্ধের ময়দানে সমুদ্রবন্দরকে প্রথমে টেনে এনেছিলেন। শুরুর দিকে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো জাহাজকে মার্কিন বন্দরে ১৪ অক্টোবর থেকে বাড়তি ফি পরিশোধ করতে হবে। জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে পরিচালিত এক তদন্তের ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক সমুদ্র পরিবহন খাতে চীনের প্রভাব হ্রাস ও মার্কিন জাহাজ নির্মাণ শিল্পের পুনরুজ্জীবন।
গতকাল কার্যকর হওয়া এ পদক্ষেপ অনুযায়ী, চীনা মালিকানাধীন বা পরিচালিত জাহাজকে মার্কিন বন্দরে পরিবাহিত পণ্যের জন্য টনপ্রতি ৫০ ডলার ফি দিতে হবে। চীনে নির্মিত অন্য দেশের জাহাজে টনে ১৮ ডলার বা প্রতি কনটেইনারে ১২০ ডলার এবং বিদেশে উৎপাদন হওয়া গাড়িবাহী জাহাজে প্রতি টনে বাড়তি ফি পরিশোধ করতে হবে ৪৬ ডলার। ২০২৮ সাল পর্যন্ত এ ফির পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটনের। এছাড়া গত শুক্রবার শিপ-টু-শোর ক্রেন ও কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জামের ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে মার্কিন মালিকানাধীন ও পরিচালিত জাহাজের ওপর চীনের আরোপিত বন্দর ফির শুরু টনপ্রতি ৪০০ ইউয়ান বা প্রায় ৫৬ ডলার থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি ফি আরোপকে ‘ভুল নীতি’ আখ্যা দিয়ে এটি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল চীনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা উচিত। যদি যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বেছে নেয়, চীন শেষ পর্যন্ত মোকাবেলা করবে। আর যদি সংলাপ বেছে নেয়, চীনের দরজা খোলা থাকবে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাতা হানওয়া ওশানের যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বেইজিং।
এর আগে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, চীন পরিচালিত যেসব জাহাজ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ইথেন ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পরিবহন করে, তাদের ক্ষেত্রে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফি স্থগিত থাকবে। তবে চীন মওকুফ না করায় এলপিজি বহনকারী ৪৫টি ভিএলজিসি (এ-জাতীয় মোট বহরের ১১ শতাংশ) বন্দর ফির আওতায় থাকবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, বন্দর ফি বাবদ কিছু কোম্পানিকে বড় অংকের খরচ গুনতে হবে। কোম্পানিগুলো ফির প্রভাব কমাতে কী ব্যবস্থা নেয় এবং কর্তৃপক্ষ তা কীভাবে প্রয়োগ করে, এর ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে। প্রাথমিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কনটেইনার পরিবহন সংস্থা কসকো। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দর ফি হিসেবে চীনা জাহাজগুলোর সম্ভাব্য মোট পরিশোধ ৩২০ কোটি ডলারের প্রায় অর্ধেকই কোম্পানিটিকে বহন করতে হবে। তবে চীনা নয় এমন সহযোগী জাহাজ অংশীদারদের মাধ্যমে সংস্থাটির এ ক্ষতি কিছু মাত্রায় পুষিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
গ্রিসের এথেন্সভিত্তিক এক্সক্লুসিভ শিপবিল্ডার্স ইনকরপোরেট এক গবেষণা নোটে বলেছে, প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপগুলো দুই দেশের অর্থনীতিকে পাল্টাপাল্টি শুল্কের এক দুষ্টচক্রে ফেলেছে, যা বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বাড়তি এ ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাংহাইভিত্তিক এক বাণিজ্য পরামর্শক বলেন, ‘নতুন ফি জাহাজ মালিকদের ব্যবসায় খুব বেশি বিঘ্ন ঘটাবে না; বরং বাড়তি খরচ পণ্যের দামে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’
ক্লাকসন্স রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ফি বৈশ্বিক জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের মোট সক্ষমতার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে জেফারিসের বিশ্লেষক ওমর নোকতার পূর্বাভাস, এ ফি বিশ্ববাজারের ১৩ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার এবং ১১ শতাংশ কনটেইনার জাহাজকে প্রভাবিত করবে।
এপ্রিলে মার্কিন ফি ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি চীনে নির্মিত জাহাজগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রগামী রুট থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করে। শিপিং লাইনগুলোর কাছে জাহাজ ইজারাদাতা সিস্প্যান চলতি মাসেই হংকং থেকে সিঙ্গাপুরে সদর দপ্তর স্থানান্তর করেছে। তারা গ্রাহকদের ফি থেকে রেহাই দিতে অন্তত ৬০টি জাহাজ পুনর্নিবন্ধন করেছে।
ভেসপুচি মেরিটাইমের প্রধান নির্বাহী লার্স জেনসেন বলেন, ‘এখন মূল প্রশ্ন হলো চীন কীভাবে ফি বাস্তবায়ন করবে। বেইজিং বলেছে, মালিকানায় মার্কিন হিস্যা ২৫ শতাংশ থাকলেই ফি প্রযোজ্য হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও চীন থেকে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও অন্য অঞ্চলের জাহাজ চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে।’
এইচএসবিসি বলছে, বৈশ্বিক শিপিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা মোট বহরের ৪ শতাংশের নিচে। কিন্তু ২৫ শতাংশ মালিকানা শর্তের কারণে এ নীতি তৃতীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হচ্ছে।
চীন ছাড়া অন্যান্য দেশের জাহাজেও নতুন ফি আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জাহাজ থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমাতে চলতি সপ্তাহে ভোটের আয়োজন করেছে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)। এখন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যেসব দেশ এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেবে সেগুলোও নিষেধাজ্ঞা ও বন্দরে শাস্তিমূলক চার্জের মুখোমুখি হতে পারে। অন্যদিকে চীন প্রকাশ্যে আইএমওর পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।